ঢাকা শুক্রবার, জুন ২৬, ২০২৬

২০১৭ জীবনের সেরা ভ্রমনের বছর – সজল জাহিদ

আমার মত উল্টো আর উদ্ভট ভাগ্যের জীব পৃথিবীতে আর কটা আছে আমার সন্দেহ আছে। নয় কেন, মানুষের যা জীবনের শুরুতে ঘটে, আমার সেসব জীবনের মধ্য বেলায় এসে ঘটছে! মানুষ নিজের ছেলে বেলাকে ফিরে পেতে চায় আর আমি আমার ছেলে বেলাকে ভুলেও মনে করতে চাইনা, মানুষ নিজেকে বর্তমানের চেয়ে বেশি বয়স্ক দেখতে চায়না আর আমি নিজেকে আরও বেশী বয়সের দেখতে চাই! অধিকাংশ মানুষই তার বর্তমান নিয়ে তেমন একটা খুশি বা তৃপ্ত নয়, কিন্তু আমি আমার বর্তমান নিয়ে শুধু তৃপ্তই নই, রীতিমত আহ্লাদিত!

হ্যাঁ সত্যিই তাই। আর কেনই বা হবনা? নিজের বর্তমানকে নিয়ে আহ্লাদিত না হবার মত অকৃতজ্ঞ আর অতৃপ্ত তো আমি নই। সেইসব সাম্প্রতিক বর্তমান আর প্রায় চলে যাচ্ছে ২০১৭ নিয়েই নিজের কাছে, নিজের জন্য, নিজের পর্যালোচনা। সত্যি, একদম সত্যিই ২০১৭ সালটা এখন পর্যন্ত আমার জীবনের সেরা বছর। অন্তত বোধ হবার পর থেকে ২০১৭ সালের মত এতো এতো প্রাপ্তির, এতো এতো আনন্দের আর এতো বেশী অবাক ও অভিভূত হবার মত বছর এর আগে আমি কখনো কাঁটাইনি।

এরপরের গল্পটুকু অনেকটা নিজের বিজ্ঞাপন বলা যেতে পারে। তাই, আমার আনন্দ, উদযাপন, প্রাপ্তি, পূর্ণতা আর নিজেকে নিজের সাথে আহ্লাদ যাদের কাছে বিরক্তিকর, বেশী-বেশী, গায়ে জ্বালা ধরানোর, মন বিষিয়ে যাবার মত, নিজের দিনটা নষ্ট করে দেবার মত মনে হবে, তারা সঙ্গোপনে আমাকে বা আমার এই নিজেকে জাহির করা লেখাকে এড়িয়ে যেতে পারেন। সবিনয়ে অনুরোধ করছি।

এবার তবে শুরু করি অনেক প্রাপ্তির ২০১৭ সালের পাওয়া ও পূর্ণতার গল্প।

আমাকে যারা কম-বেশী জানেন বা চেনেন, তারা মাত্রই বুঝতে পারছেন, যে আমার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি বলতে ওই আর কি আমার ভালোলাগার ভ্রমণ আর ভালোবাসার লেখালেখি নিয়ে থাকবে ২০১৭ এর সাতকাহন।

২০১৬ সালের ঈদ-উল-আযহার (কোরবানির ঈদের) সময় সান্দাকুফু গিয়েছিলাম বাসায় অনেকটা যুদ্ধ করেই। আর তারপর থেকেই আগে যেখানে ভ্রমণ নিয়ে টুকটাক, আড়ালে দুই একটি কটু কথা শুনতে হত, সেখানে সান্দাকুফু থেকে ফেরার পরে হয়ে গেল, বাসার নিয়মিত কথা শোনানোর একটা উপলখ্য। আর সেই সাথে আগামী বছর মানে ২০১৭ সালে পুরোপুরি ভ্রমণের উপরে নিষেধাজ্ঞা! সেইসব নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বেশ মন খারাপ করেই ছিলাম, সেই সাথে ডিসেম্বরের শুরুতে শেষ হল ভিসা নামক রুপোর চাবির মেয়াদ! উল্লেখ্য যে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরই, প্রথম কোন ডিসেম্বর যে ছুটিতে আমি বাসায় বসে কাটিয়েছি।

কিন্তু উপরওয়ালা যার সাথে থাকেন, তাকে আঁটকে রাখার সাধ্য তো কারো নেই। তাই ২০১৭ সালের প্রায় শুরুতেই কি যে হল, বাসা থেকেই একবার কলকাতায় ঘুরে আসার জন্য তোড়জোড় করতে লাগলো। জেনে তো আমি পুলকিত, অভিভূত আর আবেগে থরথর। কারন অনেক অনেক বার কলকাতা হয়ে বিভিন্ন শহরে যাওয়া হলেও, মায়া আর একটা অন্য রকম টানের শহরে কখনো থাকতে না পারার একটা আক্ষেপ রয়ে গিয়েছিল। ফেব্রুয়ারি আসতে আসতেই সবার ভিসা হয়ে গেল আর সেই সাথে কলকাতায় যাবার ট্রেন টিকেট! আমি তো মহা খুশি, কলকাতায় নিজের মত করে কয়েকদিন কাঁটাতে পারবো।

মার্চের মাঝামাঝি হয়ে গেল অনেক দিনের সুপ্ত ইচ্ছা পুরন। প্রায় এক সপ্তাহের ধীর লয়ে, অনুভব করে করে কলকাতায় কয়েকটা অলস সকাল-দুপুর-বিকেল-সন্ধ্যা আর রাত কাটানো হল, সাধ মিটিয়ে। আর ফিরে এসে তো গল্প ছিলই নানান রঙের, ঢঙের আর ঘটনার।

কলকাতা থেকে ফিরতে না ফিরতেই ছেলের মায়ের মাথায় ভারতের দুর্লভ আর সারা পৃথিবীর কাছে ভূস্বর্গ নামে খ্যাত কাশ্মীর যাবার ভূত চাপল! প্রথম কয়েকদিন মজা করছে মনে করলেও, এপ্রিলের মাঝামাঝি সেটা সত্যিকারের বিশাল পরিকল্পনায় রূপ নিল। সেই সাথে যুক্ত হল আরও কয়েকজন বন্ধু ও তাদের পরিবার। প্রায় পরিকল্পনার বাইরে থাকা বা অনেক দেরির জন্য রেখে দেয়া স্বর্গীয় কাশ্মীর ভ্রমণ হয়ে গেল, বিধাতার বিশেষ আশীর্বাদ হয়ে।

কাশ্মীর যেতে, যেতে আর ফিরে আসতে আসতে পেলাম আমার এখন পর্যন্ত লেখা সব রকম গল্পের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়তম গল্প মেহরীনের প্লট আর ধারাবাহিক ভাবে লিখে যাওয়া। যেটা লেখা আমার নিজের কাছেই একটা অন্যতম ও বিশেষ আনন্দের ব্যাপার। যদি সব লেখাই আমার কাছে অনেক আনন্দের। তবে বলতে দ্বিধা নেই, মেহরীন লেখাটা আমার কাছে বিশেষ কিছু। এটাকে একটা বিশাল উপন্যাস বানিয়ে আমি একটা অন্যরকম কিছু করতে চাই, কোন এক সময়।

আর কাশ্মীর থেকে ফিরে, গল্প গুলো লিখে পোস্ট করার পাশাপাশি পেলাম একটা অন্য রকম আহ্বান। একটি অন লাইন নিউজে কাশ্মীরের লেখা গুলো ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের আমন্ত্রণ! যেটা আমার কাছে একটা অন্য রকম প্রাপ্তির, তার মানে কিছু লেখা হচ্ছে বোধয়। কেউ যেহেতু নিজ থেকে যোগাযোগ করে তাদের নিউজের ভ্রমণ পাতায় আমার লেখা নিয়মিত চাইছে।

কাশ্মীর যাবার বেশ আগেই, কেটে রেখেছিলাম অনেক দিনের লালিত স্বপ্নের লাদাখ যাবার ট্রেন টিকেট। যাওয়া আর আসার। অফিসের বিশাল ছুটির ক্যালেন্ডার দেখেই। সে যাওয়া হোক বা না হোক। টিকেট না হয় পরে ফেরত দেয়া যাবে, কিন্তু সুযোগের স্বদ ব্যবহারে আমি সব সময়েই পারদর্শী বলে হাল ছাড়িনি, শেষ সময় পর্যন্ত। হাজারো ভ্রমণ রাজনৈতিক চাল চেলে সফল করেছিলাম, নিজের দীর্ঘ পাঁচ বছরের লালিত স্বপ্নের। স্বপ্নের রুট ধরে স্বপ্নের পথ পাড়ি দিয়ে, পার্পেল ড্রিমের পূর্ণতার।

লাদাখ থেকে ফিরে আসার পরে, আমার জন্য অপেক্ষা করছিল এরচেয়েও বড় প্রাপ্তির। সবই বিধাতার অসীম আশীর্বাদ ছাড়া আর কিছুই নয়। আর সেটা হল, পার্পেল ড্রিমের সবগুলো (৫১) টা গল্প লেখার পরেই, প্রিয় ডট কম আমার পার্পেল ড্রিম (লাদাখ ভ্রমণ) এর সবগুলো গল্প ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে চেয়ে আগ্রহ দেখালো! আমি তো প্রস্তাব পেয়ে অভিভূত! আমার লেখা কি আদৌ এমন কিছু, যে কোন অন লাইন পোর্টাল ধারাবাহিকভাবে সব গুলো গল্পই প্রকাশ করতে চাইছে? যদিও শেষ পর্যন্ত প্রিয় ডট কম থেকে প্রতিদিন একটি করে গল্প প্রকাশিত হচ্ছে ধারাবাহিক ভাবেই। এটা আমার কাছে একটা অনেক বড় পাওয়া।

আর শুধু প্রিয় ডট কম নয় আরও দুই, তিনটি পোর্টাল নিয়মিত লেখা চায়, প্রকাশ করে, নিজেদের একান্ত আগ্রহ থেকেই। ব্যাপারটা মন্দ লাগেনা আদৌ। তার উপর মাঝে মাঝে অন্যতম প্রাপ্তি হয়ে আসে একটি জাতীয় দৈনিক, কালের কণ্ঠে দুই একটি লেখা। এসব কি ভালো না লেগে পারে? আমার মত নগণ্যর কাছে এতো অনেক অনেক কিছু।

লাদাখ থেকে ফিরে, বাসায় তোলপাড় অবস্থা! কথা দিলাম অন্তত দুই বছর আর কোথাও যাবনা! পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত হল, নিজেও নিজেকে বোঝালাম যে, একটুনা, বেশ বেশী-বেশীই হয়ে যাচ্ছে, তাই থাক না হয় অন্তত একটি বছর চুপচাপ, ভ্রমণ ছাড়া! কিন্তু ভাগ্যে থাকলে আর বিধাতা চাইলে আর ঠেকায় কে?

হুট করে বাসা থেকেই প্রস্তাব দেয়া হল, দার্জিলিং যাওয়া যায় কিনা! আরে বলে কি? আমি তো মনে অনে এইটাই চাই! কবে থেকে আমার প্রেয়সীকে কথা দিয়ে বসে আছি যে বছরে অন্তত একবার তার কাছে যাবো, একসাথে হাটবো, পাশাপাশি বসবো, ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকবো, বছরে অন্তত একবার! তাই দার্জিলিং যাবার উপায় আমাকে বের করতেই হবে। এরই মাঝে জানলাম অন্য পোর্টের ভিসা থাকলেও বুড়িমারি দিয়ে দার্জিলিং যাওয়া যাচ্ছে, কিছু উপরি টাকার বিনিময়ে। ব্যাস আমাকে আর ঠেকায় কে?

সবকিছু ঠিকঠাক করে প্রেয়সীকে দেয়া কথা রেখে এলাম সদ্য, ছুঁয়ে এলাম আর দেখে এলাম তাকে, কুয়াসার আচলে মুখ ঢেকে রাখা ঘোমটা খুলে! নিজের হাতের আলতো পরশে আদরে উষ্ণতা দিয়ে, একান্ত আলিঙ্গনে বেঁধে মান ভাঙিয়ে এলাম আমার আজন্ম প্রেয়সীর! সেই গল্প গুলো এখন লিখছি।
আর প্রেয়সীর আলিঙ্গন থেকে ফিরেই পেলাম বছরের সেরা উপহার!

আমেরিকার, ফ্লোরিডা থেকে আমার লেখা একটা গল্প প্রকাশিত হবার মত অনাকাঙ্ক্ষিত আর চমকপ্রদ কিছু! অবিশ্বাস ঠেকেছে নিজের কাছেই!
এতো এতো প্রাপ্তি, পূর্ণতা আর প্রশান্তিতে ভরা আমার ২০১৭। আমি কি আহ্লাদিত না হয়ে পারি? ও হ্যাঁ আর একটা বিশেষ প্রাপ্তি যোগ হল, আমার ভ্রমণের প্রতি ছেলের মায়ের বিরাগ আজকাল বিপরীত মুখী হয়েছে। আগে আমি যেখানে একটা ভ্রমণ থেকে ফিরে পরের ভ্রমণের পরিকল্পনা করতাম, আজকাল আর আমাকে সেটা করতে হয়না, তিনি নিজেই করে ফেলেন! আমার ভ্রমণের নেশা তার উপর চেপেছে অবশেষে!

আরও কিছু অন্য রকম প্রাপ্তি আছে ২০১৭ তে। যেটুকু শুধু আমার নিজের কাছে, একান্ত ভাবে, নিজের গোপন আনন্দ হয়েই না হয় থাক।
তাই পুরো ২০১৭ নিয়ে আমি ভীষণ খুশি, দারুন আনন্দিত, অনেক প্রাপ্তি আর পূর্ণতায় টইটুম্বর আমার আহ্লাদে অবগাহনের জলাশয়!

এই ২০১৭ এর শেষ সময় এসে বিধাতার কাছে আমার সব সময়ের চাওয়ার মত করেই চাওয়া……

আমাকে তুমি এরচেয়ে বেশী কিছু না দাও, কোন আপত্তি নেই, এতটুকু রাগ, ক্ষোভ বা হতাশা আমি ব্যাক্ত করবোনা, শুধু তোমার কাছে চাওয়া?

আসছে ২০১৮ যেন এর চেয়ে বিবর্ণ না হয়, বেশী কিছু চাইনা আমি, যেটুকু ভালোবাসা, সম্মান আর প্রাপ্তি দিয়েছ অন্তত সেটুকু ঠিক রেখ। যেভাবে রেখেছ ২০১৭ তার চেয়ে ভালো না হোক, তার চেয়ে খারাপ রেখনা আসছে ২০১৮ তে…..

৩১ ডিসেম্বর ২০১৭